saraswati puja

‘ক্যালেন্ডারের সরস্বতী চাই না’

বলছেন রবীন্দ্রনাথ। চাইছেন দিব্য-প্রজ্ঞা সরস্বতীর চিত্রাভাস। সেইমতো আঁকতে বলছেন অসিতকুমার হালদারকে। সে গল্প শোনাচ্ছেন অসিতকুমার হালদার, তাঁর রবিতীর্থে বইয়ে,
‘সে বার গরমের ছুটিতে রাঁচি গেছি, আমার ছাত্র মুকুলচন্দ্র দে আছেন আশ্রমে৷ আমার অনুপস্থিত-কালে নতুন ছবির জন্যে বিষয়বস্তু ভাবতে না পেরে তিনি গেলেন গুরুদেবের কাছে৷ কবি তাঁকে বললেন, ‘আমার উপযুক্ত একটি সরস্বতী আঁক, দিব্য প্রজ্ঞা, ক্যালেন্ডারের সরস্বতী চাই না৷ মুকুল কোমর বেঁধে লেগে গেলেন একটার পর একটা সরস্বতী আঁকতে, রবিদাদার কিন্তু একটিও মনে ধরল না৷ অবশেষে গ্রীষ্মাবকাশের পর আমি ফিরে আসতেই রবিদাদা তাঁর কথা সব বললেন এবং পুনরায় আমাকে তাঁর দিব্য প্রজ্ঞা সরস্বতীর চিত্রাভাস তৈরি করতে বললেন৷ তিনি যে ভাবে বর্ণনাকালে জ্যোতিদৃপ্ত ভাব প্রকাশ করেছিলেন তাতে তাঁর সরস্বতীর আভাস পেয়ে একটি অগ্নিময়ী সরস্বতী আঁকলুম৷ রঙিন ছবিটি সম্পূর্ণ করে রবিদাদার সামনে ধরতেই তাঁরও মনে সুরের রঙ ধরলো…’৷

অসিতকুমার হালদারের আঁকা অগ্নিময়ী সরস্বতী
অসিতকুমার হালদারের আঁকা অগ্নিময়ী সরস্বতী

আধুনিক শিল্পীর দৃষ্টিতে দেবী সরস্বতী এসেছেন নানা রূপে, নানা গভীর বোধে। কিন্তু নিছক দেবীর ছবি হিসেবে সরস্বতীর উপস্থিতি সেই উনিশ শতকের লিথোগ্রাফ এবং ওলিয়োগ্রাফ থেকেই। সারা দেশ জুড়ে স্বল্পমূল্যে ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনি আর দেবদেবীর ছবি লিথোগ্রাফ ও ওলিয়োগ্রাফে প্রিন্ট করে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন রবি বর্মা।

সেকালের কলকাতায় রুচিশীল বাঙালি পরিবারে তার প্রভাব ছিল অসামান্য। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সাধনা’ (আশ্বিন-কার্তিক, ১৩০০) পত্রিকায় ‘রবি বর্মা’ নামে নিবন্ধে লিখেছিলেন,
“একটি যথার্থ চিত্রকরী প্রতিভা, যে কেবল কপি না করিয়া সৌন্দর্য্য অনুভব ও প্রকাশ করিতে পারে, যে মধুপের মত পুষ্প হইতে পুষ্পান্তরে উড়িয়া গিয়া সৌন্দর্য্য চয়ন করিয়া আনে এবং সেই সৌন্দর্য্যের চাক বাঁধিয়া চিত্ত হরণ করিতে জানে। এই প্রতিভা রবি বর্মার পৌরাণিক চিত্র এমন সুন্দরভাবে এদেশে ইতিপূর্বে কখনও অঙ্কিত হয় নাই। এবং খুঁটিনাটি ত্রুটি থাকিলেও রবি বর্মাই এদেশের প্রথম প্রতিভাশালী শিল্পী”।

রবি বর্মার সরস্বতী
রবি বর্মার সরস্বতী

রবি বর্মার ছবি প্রথম দিকে টেনেছিল রবীন্দ্রনাথকেও। ইন্দিরা দেবীকে লিখছেন,
‘রবিবর্মার ছবি দেখতে দেখতে সমস্ত সকালবেলাটা গেল৷ আমার সত্যি বেশ লাগে৷ হাজারই হোক, আমাদের দিশি বিষয় এবং দিশি মূর্তি ও ভাব আমাদের কাছে যে কতখানি, এই ছবিগুলি দেখলে তা বেশ বোঝা যায়৷ অনেকগুলো ছবির হাত পা, দেহের পরিমাণ, খুব অসমান আছে, কিন্তু মোটের উপর সবসুদ্ধ জড়িয়ে খুব মনের ভিতরে প্রবেশ করে৷ তার প্রধান কারণ, আমাদের মনটা চিত্রকরের সহযোগিতা করতে থাকে৷ সে কী বলতে চাচ্ছে আমরা আগে থাকতে বুঝে নিই—তার চেষ্টাটুকু দেখলেই বাকিটুকু পূরণ করে নিতে পারি৷ এর ভিতর থেকে খুঁত বের করা খুব সহজ, তার জন্যে বেশি ক্ষমতার দরকার করে না, কিন্তু যখন ভেবে দেখা যায় কোনো বিষয়ে একটা স্পষ্ট কল্পনা করা কতই শক্ত—মনে আমাদের যে ছবিটা উদয় হয় তা প্রায়ই আধা-আধি, মোটামুটি গোঁজা-মিলন-দেওয়া—
কিন্তু ছবি আঁকতে গেলে একটি সামান্যতম রেখা পর্যন্ত ছাড়বার যো নেই, প্রধান অপ্রধান সমস্তই একেবারে যথাযথ করে ভেবে নিতে হবে, কল্পনার মতো অমন একটা নিয়তপরিবর্তমান জিনিষকে প্রত্যক্ষের কঠিন ছাঁচে ঢেলে দিতে হবে—সে কি সামান্য ব্যাপার!’

দেশীয় বিষয়ের জন্যই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ আকৃষ্ট হয়েছিলেন রবি বর্মার ছবিগুলিতে। সেটাই টেনেছিল প্রবাসী, মডার্ম রিভিউ-এর সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কেও। কিন্তু পরে ভগিনী নিবেদিতার প্রেরণায় সে মোহ কাটে।

রামানন্দ লিখেছেন,
‘আমি আমাদের দেশের আমার মতো শিক্ষিত ব্যক্তিদের চেয়ে দেশী বিদেশী ছবি কম ঘাঁটিয়াছি বলিয়া বোধ হয়না। দেশীয় আধুনিক ভিন্ন-ভিন্ন রীতির ছবি ছাপিয়া অর্থ ‘নষ্ট’ করিয়াছি এবং বিদ্রূপভাজন হইয়াছি সমুদয় ভারতবর্ষীয় সম্পাদকের চেয়ে বেশি। তাহাতে আমার চিত্রকলা সম্বন্ধে কিছু বলিবার অধিকার জন্মিয়াছে মনে হয়না। তবে আমার ধারণা এই হইয়াছে যে, অবনীন্দ্রবাবু ও তাঁহার ছাত্ররা চিত্রকলার প্রাণের সন্ধান পাইয়াছেন এবং অনেকে অতি উৎকৃষ্ট ছবি আঁকিয়াছেন। সঙ্গীতনিপুণ ওস্তাদের দুএকটা মুদ্রাদোষে যেমন তাঁহার গুণ ঢাকা পড়ে না, তেমনি নবীন শিল্পীদের কোনো-কোনো ছবিতে ম্যানারিজমের আতিশয্য থাকিলেও তাহা ধর্তব্য নয়, এবং এই ম্যানারিজম সব ছবিতেও আছে এরূপ মনে করা ভুল। হ্যাভেল সাহেবের মত যদি অন্য বিষয়ে গ্রাহ্য হয় তাহা হইলে নবীন শিল্পীদের তিনি যে-প্রশংসা করিয়াছেন, তাহা অবজ্ঞেয় হইতে পারে না। আমি একসময় রবিবর্মা ও তাঁহার সম্প্রদায়ের গোঁড়া ছিলাম। আমার লেখা তাঁহার সচিত্র জীবনচরিত এখনও বাজারে বিক্রি হয়। আমি তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ। ৫/৬ বৎসর পূর্বে ছবি সম্বন্ধে স্বর্গীয়া ভগিনী নিবেদিতার সহিত উত্তেজিতভাবে চিঠি লিখিয়া রবিবর্মার পক্ষাবলম্বনপূর্বক তর্ক করিয়াছিলাম। আমার চিঠির উত্তরে সেই মনস্বিনী বত্রিশ পৃষ্ঠার এক চিঠি লিখিয়া, একটু বিবেচনার পর, তাহা আমাকে পাঠান নাই। তাঁহার সেই চিঠি বোধহয় এখনও আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মহাশয়ের নিকটে আছে। পরে স্বর্গীয়া লেখিকারই মুখে শুনিয়াছি যে, তিনি এই ভাবিয়া উহা আমাকে পাঠান নাই যে, আমি ছবি দেখিতে-দেখিতে উহার মর্মজ্ঞ হইব, তর্কদ্বারা আমার চোখ খুলিবে না। মর্মজ্ঞ হইয়াছি কিনা জানিনা, কিন্তু এখন তাঁহার যেরূপ ছবি ভালো লাগিত আমিও তদ্রুপ ছবির অনুরাগী হইয়াছি।কেবলমাত্র স্বভাবের অনুকরণ বা বস্তুতন্ত্রতা যে আর্ট নহে, তাহা বুঝিতে আমার অনেক সময় লাগিয়াছে।’

এই রবি বর্মা এবং বাঙালি শিল্পী অন্নদাপ্রসাদ বাগচী ও বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লিথোগ্রাফের ছবি সে কালে বাঙালির ঘরে ঘরে ছড়িয়ে গিয়েছিল ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে। শিল্পীদের ব্যক্তিগত চেতনার ছায়া সে সব ছবিতে ছিল না। তা ছিল টাইপ ধরনের। ক্রমে দেবদেবীর ধারণা, ঈশ্বরের ধারণা যত ব্যক্তিগত হয়ে উঠবে রবীন্দ্রনাথে, তিনি ততই দূরে সরে যাবেন টাইপ দেবতাচিত্রণ থেকে। তাই অসিতকুমারকে লিখবেন, ক্যালেন্ডারের সরস্বতী চাই না।
টাইপ থেকে ব্যক্তিগতে সরস্বতীর পেন্টিংয়ে বাঙালি শিল্পীর সরে আসাটা নন্দলাল বসুতেও স্পষ্ট। সমসময় তাঁর দেবীরূপকল্পনাকে প্রবল ভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বরে এঁকেছিলেন ‘অন্নপূর্ণা’ — পদ্মাসীনা, অন্নদাত্রী, একটি বাটি ও এক মুঠো চাল ধরে আছেন। কঙ্কালসার শিব খুলি দিয়ে তৈরি ভিক্ষাপাত্র পেতেছেন তাঁর সামনে। দুর্ভিক্ষের ছায়া দেবকল্পনাতেও পড়ল।

saraswati by Nandalal basu
নন্দলাল বসুর আঁকা সরস্বতী

নন্দলালেরই আর একটি ছবি সরস্বতী। ১৯৪১-এ, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বছরে আঁকা। জ্ঞান, বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী দাঁড়িয়ে। শরীর থেকে পদ্মফুল উৎসের মতো ছড়িয়ে জ্যোতির্বলয় সৃষ্টি করেছে। তিনি আছেন বাঙালির চিরকালীন কুলুঙ্গির মধ্যে। খেয়াল করার মতো যে সরস্বতীর সঙ্গে জ্যোতির এই সম্পর্ক অন্ধকার থেকে প্রজ্ঞার আলোয় যাওয়ার ইঙ্গিত। অথচ আদি বৈদিক অর্থে সরস্বতীর সঙ্গে জলের সম্পর্ক বেশি, আলো বা জ্যোতির নয়, অন্তত ঋগ্বেদের যুগে তো নয়ই। উমেশচন্দ্র বটব্যালের মতো কেউ কেউ সরস্বতী-র মূল শব্দ সরস্-এর অর্থ জ্যোতিঃ বলেছিলেন। কিন্তু অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ সে মত খণ্ডন করেছেন,
প্রাচীন ঋষিগণ সরস্বতীর স্তুতি করিতেন। তাঁহারা সরস্বতী বলিলে কি বুঝিতেন? ‘সরস্’ শব্দের আদিম অর্থ যে ‘জল’ ভিন্ন অন্য কিছু ছিল না, তাহা বেদের গোড়ার দিকের মন্ত্র হইতে বেশ বোঝা যায়। স্বর্গী’য় উমেশচন্দ্র বটব্যাল মহাশয় বলেন, ‘এক্ষণে যে সকল বৈদিক শব্দ অপ্রচলিত হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তন্মধ্যে ‘সরস্’ একটি। সরস শব্দের আদিম অর্থ’ জ্যোতিঃ; এবং তজ্জন্য সূর্যে’র একটি বৈদিক নাম “সরস্বান্”। সরস্বতী, — অর্থাৎ ‘জ্যোতির্ময়ী দেবতা।’ বটব্যাল মহাশয়ের উক্তির সমর্থন-পক্ষে তেমন যুক্তি পাওয়া যায় না। ঋগ্বেদে ‘সরস্বৎ’ শব্দ তিন বার মাত্র আছে। দশম মন্ডলে (৬৬. ৫) প্রথমান্ত ‘সরস্বান’ এবং অন্যত্র (১. ১৬৪.৫২; ৭.৯৬. ৪) দ্বিতীয়ান্ত ‘সরস্বন্তম্’। দশম ও সপ্তম মন্ডলে ‘সরস্বৎ’ শব্দের অর্থ ‘জলাধিপতি। প্রথম মন্ডলে ইহার অর্থ ‘সূর্য’। এখানে সূর্য’ জলের গর্ভোৎপাদক; সুতরাং ইহার সহিতও জলের সম্পর্ক’। কাজেই সূর্যের এই নামের সার্থকতা এ দিক্ দিয়াও থাকিতে পারে। ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ-যুগে ‘সরস্’ শব্দের অর্থ’ পরিবর্তিত হইয়াছে, এ কথা স্বীকার করা যাইতে পারে।…হয়তো এইরূপেই পরযুগে সরস্বতীর একটি পর্যায় হইয়া থাকিবে- ‘জ্যোতির্ম’য়ী’। কিন্তু ‘সরসের’ আদিম অর্থ’ জ্যোতি নয়।

ঋষির ভাবনায় যেমন, কবির এবং শিল্পীর ভাবনাতেও তেমনই সরসতার দেবী আসেন নানা ভাবনার দিকনির্দেশ নিয়ে।